"মতি পাগলা"
ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ক্লাসের সবাই হাসছে। মাথা নিচু করে কানে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটার নাম মতি। গরীব ঘরের সন্তান। ক্লাস ফাইভের ছাত্র। বিশেষ বিবেচনায় পাস করেছে।
একটা সময় এই মতিই ছিলো ক্লাসের সবথেকে ভালো ছাত্র। কিন্তু এখন আর পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ নেই।
ছেলেটা লেখতে ভালোবাসে। চোখের সমানে ঘটা উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোকে একটা কাগজে বন্দী করতে রাখতে ভালোবাসে ছেলেটা। কিন্তু স্কুলের সহপাঠীদের কাছে মতি বরাবরই একটা হাসির পাত্র। ছেলেটাকে অনেকে আবার পাগল বলেও ডাকে। কয়েকজন শিক্ষক মতিকে মতি পাগলা বলেও ডাকে।
ছেলেটার স্কুল জীবনটা এমনই। প্রতিদিন ক্লাসে মতিকে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। প্রতিদিনই স্কুলে বকা শুনতে হয়। সবাই ছেলেটাকে নিয়ে হাসে। কারণ একটাই, মতি স্কুলের পড়া শিখে আসে না। পরীক্ষার খাতায় বইয়ের পড়া ছাড়া চোখের সামনে ভেসে উঠা বাস্তবতাকে লেখে আসে। রেজাল্টও আসে শূন্য। মাঝে মধ্যে শিক্ষকেরা ১-২ নম্বর দেন। কিন্তু এর পেছনের কারণটাও কারোও জানা নেই। হয়তো লেখাগুলো ভালো লাগে।
মতির পরিবার এবং স্কুলের শিক্ষক,ছাত্রসহ সবার কাছে মতি একটা পাগলের নাম। সবাই মতির প্রতিভা নিয়ে হাসে। অনেকে আবার সুযোগ পেলে ছেলেটার গায়ে হাতও তুলে। আজ যদি মতি স্কুলের পড়াটা নিয়মিত শিখে আসতো তবে সবার চোখে মতি একটা ভদ্র ছেলের নাম হতো। স্কুলের সবাই আর মতির পরিবারের কাছে মতির প্রতিভার কোন মূল্য নেই। মূল্য আছে মুখস্থ বিদ্যার। প্রায়ই স্কুলে ডেকে নিয়ে মতির মা'কে অনেক কথা শোনানো হয়। ছেলেটাকে পড়াশোনা করিয়ে লাভ হবে না বলে তাচ্ছিল্য করে অনেক শিক্ষকই। আর মতির পরিবার এই ছেলেটার উপর অত্যাচার করে।
কোন রকমে পাস করতে করতে মতিটা আজ ক্লাস টেনে। মতি আগের মতোই রয়ে গেল। পরীক্ষার খাতায় এখনও অনেক কিছুই লেখে আসে। স্কুলের সবার কাছে আজও মতির নাম মতি পাগলা। মতি পাগলা বলেই অনেকে জানে। পরিবার এখনও মতিকে অত্যাচার করে। কিন্তু এখন আর কষ্ট লাগে না। সহ্য হয়ে গেছে।
মতি মনে মনে ঠিক করলো আর পড়াশোনা করবে না। শুধু লেখবে। দিনে-রাতে লেখবে। যা ইচ্ছে লেখবে। কিন্তু পরিবারের ভয়ে সাহস পাচ্ছে না। সামনেই পরীক্ষা। কি করবে ভাবতেছে।
রাতেই মতি তার মাকে বলে দিলো সামনের পরীক্ষায় মতি আর অংশগ্রহণ করছে না। মতির মা প্রথমে কথাটার তেমন গুরুত্ব দেন নি। কিন্তু মতি একই কথা বারবার বলে যাচ্ছে। তারপর সোজাসুজিই বলে দিলো আর পড়াশোনা করবে না।
কথাটা শুনে মতির মা-বাবা রেগে আগুন। ছেলেটাকে মারধর করে বাড়ি থেকে রাতেই বের করে দিলেন। মতিটাও কাঁদতে কাঁদতে একটা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল। মাত্র একটা ব্যাগই এখন তার সম্বল। ব্যাগে একটা খাতা,একটা কলম আর কয়েকটা কাপড়। মতি ঠিক করলো আর কোনদিন বাড়িতে ফিরে যাবে না। যে বাড়িতে তার জীবনের চেয়েও পড়ালেখার মূল্য বেশি ঐ বাড়িতে সে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে না। একদিন প্রমাণ করবে পড়ালেখা থেকেও নিজের ভালো লাগা বা ইচ্ছেটা বড়, এমন জেদ করলো মতি। শীতের রাতটা হাঁটতে হাঁটতেই কাটিয়ে দিলো। সকাল সকাল একটা চাকরির খোঁজ করতে লাগলো। গ্রামের বাজারের একটা চায়ের স্টলে চাকরি হলো মতির। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করতে হবে। থাকা,খাওয়া ফ্রি। বেতনটাও বেশি না। কোন রকমে চলে যাবে। মাস শেষে দুটো খাতা এবং তিন বা চারটা কলম কিনতে পারলেই তার চলে।
মতির সহপাঠী যারা ছিলো তারা এখনও মতিকে নিয়ে হাসে। একটা চায়ের দোকানের চাকর বলে লজ্জা দেয়। কিন্তু মতিটা একটুও রাগ করে না। হাসি মুখেই সবকিছু মেনে নেয়। মতির মা-বাবা ছেলেটার খোঁজ করে প্রায়ই কিন্তু মতি জানিয়ে দিয়েছে সে আর বাড়িতে ফিরবে না। আর লেখাপড়াও করবে না।
সারাদিন কাজ করে সন্ধ্যার পর লেখতে বসে পাগলটা। সারাদিন যা যা করেছে বা যা চিন্তা করছে সেইসব নিয়ে লেখতে বসে। আর প্রত্যেকটা লেখা শেষ করে একা একাই জোরে শব্দ করে পড়তে থাকে। এটাই মতির জীবন। লেখতে ভালোবাসে বলে ছেলেটা আজ একা। কেউ নেই পাশে দাঁড়াবার। সবাই মতিকে নিয়ে হাসে। সবাই মতির লেখালেখি নিয়ে লজ্জা দেয়। তারপরও ছেলেটা থেমে নেই। চালিয়ে যায় তার লেখা।
মতি তার একটা লেখা পত্রিকায় প্রকাশ করার জন্য আবেদন করে। কিন্তু এখানে সবাই মতিকে নিয়ে হাসছে। কাজ করে জমানো কিছু টাকা দিয়ে পত্রিকায় মতির একটা লেখা প্রকাশ করে। কিন্তু মতির লেখাটা পড়ে সবাই অবাক। স্কুলের সহপাঠী যারা একদিন মতিকে নিয়ে হাসতো তারাই মতির লেখা পড়ে অবাক হয়ে গেল। এই ছেলেটার দ্বারা এমন লেখা কিভাবে সম্ভব। মতির বাবা-মায়ের কাছেও খবর পৌঁছে গেল। কিন্তু তারা খবরটা কানে জায়গা দিলেন না। তাদের কাছে এখন টাকাই সব। পত্রিকায় লেখা প্রকাশ হলে কি হবে।
মতির লেখাটা প্রকাশ হওয়ার পর অনেক সাড়া পায়। ঐ দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকরা মতিকে জানিয়ে দেন আগামীতে মতির কোন লেখা প্রকাশ করতে আর টাকা লাগবে না। তারা ফ্রি-তেই প্রকাশ করবে।
এভাবেই মতির পথচলাটা শুরু হয়। একজন-দুজন করে মতি পাগলটার আজ অনেক অনেক ফ্যান। সারাদেশের মানুষ সারা সপ্তাহ অপেক্ষায় থাকে মতির নতুন লেখা পড়বে বলে। সপ্তাহে একদিন মতির একটা লেখা প্রকাশ হয়। এভাবেই একজন লেখক হিসেবে মতির আত্মপ্রকাশ।
মতির পাশে এগিয়ে আসে কয়েকটা সংগঠন। তারা নিজের পকেটের টাকা দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় মতির লেখা একটা বই প্রকাশ করবে। মতি একটা সংগঠন এর সাথে কথা বলে সবকিছু ঠিক করে। চায়ের দোকানে আর কাজ করতে হয় না। এই সংগঠন থেকেই মতিকে মাস শেষে কিছু টাকা দেওয়া হয়।
একদিন চায়ের দোকানে কাজ করা মতি পাগলাটা আজ দেশ সেরা লেখকদের একজন। নিজের প্রকাশিত কয়েকটা বই দিয়ে লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষের মন জয় করে নিয়েছে। একদিন যারা মতিকে নিয়ে হেসেছিল সবাই আজ মতির বই পড়ে রাত কাটায়। মতির বাবা-মাও নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছেন। ফিরে এসেছেন নিজের ছেলের কাছে। মতির পরিবার আজ গর্ব করে বলতে পারে তাদের ছেলেটা একজন বড় মাপের লেখক। ঐদিন যদি মতিটা বাড়ি ছেড়ে বেড়িয়ে না আসতো তবে হয়তো মতির এত দূরে আসা সম্ভব হতো না। নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতো বইয়ের পাতায়ই। দিতে হতো পরীক্ষা,যেখানে মুখস্থ বিদ্যাটাকেই প্রতিভা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।
মতি পাগলাটা আবারও প্রমাণ করলো প্রতিভাটাই আসল। জীবনটা এমন না যে বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ করে রাখবে। প্রতিভা নিয়ে যুদ্ধ করে যাও জয়টা তোমারই হবে।
No comments:
Post a Comment